ঢাকা | , ১২ মাঘ ১৪৩১ বঙ্গাব্দ

চট্টগ্রাম-১৪ আসনে ভোটের সমীকরণ জটিল: ইমেজ, আঞ্চলিকতা ও বিদ্রোহে জমে উঠেছে নির্বাচন

ডেস্ক রিপোর্ট
নিউজ প্রকাশের তারিখ : Feb 6, 2026 ইং
ছবির ক্যাপশন: ছবির ক্যাপশন:
আলমগীর নিশান( চট্টগ্রাম প্রতিনিধি)

চট্টগ্রাম-১৪ (চন্দনাইশ–সাতকানিয়া) আসনের নির্বাচনী পরিস্থিতি এবার একেবারেই ভিন্ন। ইমেজধারী প্রার্থী, আঞ্চলিক প্রভাব, বিদ্রোহী প্রার্থী ও দলীয়–জোটের সমীকরণ—সব মিলিয়ে শেষ পর্যন্ত কার ঝুলিতে যাবে বিজয়, তা নিয়ে জল্পনা-কল্পনা তুঙ্গে। রাজনীতি বিশ্লেষকদের মতে, এ আসনে প্রচলিত দলীয় হিসাবের বাইরে কিছু স্বতন্ত্র সূচকই ফল নির্ধারণে বড় ভূমিকা রাখতে পারে।

ইমেজধারী প্রার্থী: কর্ণেল অলির প্রভাব কতটা কাজে লাগবে?

এ আসনে এলডিপি থেকে জামায়াত জোটের প্রার্থী অধ্যাপক মো. ওমর ফারুক। তিনি এলডিপি সভাপতি অবসরপ্রাপ্ত কর্ণেল অলি আহমদ বীর বিক্রমের ছেলে। ভোটারদের বড় একটি অংশের কাছে দলীয় পরিচয়ের চেয়েও বড় পরিচয়—তিনি কর্ণেল অলির সন্তান।

২০০৮ সাল পর্যন্ত টানা ছয়বার সংসদ সদস্য ছিলেন কর্ণেল অলি আহমদ। বিএনপি সরকারের সময় যোগাযোগমন্ত্রী হিসেবে দায়িত্ব পালনকালে চন্দনাইশসহ দক্ষিণ চট্টগ্রামে ব্যাপক সড়ক উন্নয়ন করেন তিনি। পরবর্তীতে বিএনপি ছেড়ে এলডিপি গঠন করলেও এই অঞ্চলে তার জনপ্রিয়তা এখনও অটুট বলে মনে করেন স্থানীয়রা।

৫ আগস্টের পর থেকে কর্ণেল অলি নিজে ছেলেকে সঙ্গে নিয়ে এলাকায় গণসংযোগ চালাচ্ছেন। বাবার দীর্ঘ রাজনৈতিক ঐতিহ্য ও ব্যক্তিগত ইমেজ ওমর ফারুকের জন্য বড় শক্তি হয়ে উঠতে পারে বলে ধারণা ভোটারদের।
এলডিপি প্রার্থী ওমর ফারুকের প্রধান নির্বাচনি সমন্বয়ক ইয়াকুব বলেন,

“২০০৮ সালে আওয়ামী লীগ ও বিএনপি-জামায়াত জোটের বাইরে গিয়ে কর্ণেল অলি আহমদ এলডিপি থেকে এককভাবে নির্বাচিত হয়েছিলেন। তার মতো করেই ছেলে ওমর ফারুকও এ আসনে জয়ী হবেন, ইনশাল্লাহ। মানুষ সবসময় যোগ্য প্রার্থীকে ভোট দেয়।”

আলোচিত বিএনপি প্রার্থী: 

জসিম উদ্দিনের শক্তি ও দুর্বলতা আলোচনা-সমালোচনার কেন্দ্রবিন্দুতে রয়েছেন বিএনপির প্রার্থী জসিম উদ্দিন আহমদ। ২০২৪ সালের উপজেলা পরিষদ নির্বাচনে তিনি চন্দনাইশ উপজেলা আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক আবু আহমেদকে পরাজিত করে চেয়ারম্যান নির্বাচিত হন। তখন নিজ দল ক্ষমতায় থাকা সত্ত্বেও আবু আহমেদের পরাজয় জসিম উদ্দিনের রাজনৈতিক প্রভাব ও শক্তিশালী ‘মেকানিজমের’ প্রমাণ হিসেবে আলোচিত হয়।
তবে তার বিরুদ্ধে বৈষম্যবিরোধী আন্দোলনে হামলার অভিযোগে মামলা, কারাবরণ এবং সাবেক আইজিপি বেনজীর আহমেদের সঙ্গে ব্যবসায়িক সংশ্লিষ্টতার গুঞ্জন রয়েছে। দীর্ঘদিন বিএনপির রাজনীতিতে সক্রিয় না থেকেও মনোনয়ন পাওয়ায় দলীয় নেতাকর্মীদের মধ্যে অসন্তোষও স্পষ্ট।

ফলে বিশ্লেষকদের মতে, এ আসনে বিএনপির ভোট কার্যত তিন ভাগে বিভক্ত—এক ভাগ জসিম উদ্দিনের, এক ভাগ কর্ণেল অলির ছেলে ওমর ফারুকের দিকে ঝুঁকছে, আরেক ভাগ যাচ্ছে বিদ্রোহী প্রার্থীদের ঘরে।
বিএনপি প্রার্থী জসিম উদ্দিনের প্রধান নির্বাচন সমন্বয়ক ও কেন্দ্রীয় ছাত্রদলের সাবেক সহসভাপতি এম এ হাশেম রাজু বলেন,

“স্রোতের বিপরীতে গিয়ে কেউ টিকে থাকতে পারে না। বিদ্রোহী প্রার্থী থাকলেও তাতে কোনো প্রভাব পড়বে না। সাধারণ মানুষ ধানের শীষের পক্ষেই অবস্থান নিয়েছে।”

আঞ্চলিকতা ও বিদ্রোহী প্রার্থী: বিএনপির ভোটে ভাঙন?

চট্টগ্রাম-১৪ আসনটি চন্দনাইশ উপজেলা এবং সাতকানিয়া উপজেলার ছয়টি ইউনিয়ন—কেউচিয়া, কালিয়াইশ, বাজালিয়া, ধর্মপুর, পুরানগড় ও খাগড়িয়া—নিয়ে গঠিত। মোট ভোটার সংখ্যা ৩ লাখ ১৩ হাজার ৪৩১ জন। এর মধ্যে প্রায় ৯০ হাজার ভোটার সাতকানিয়ার ছয় ইউনিয়নের।

এই আঞ্চলিক বিভাজন নির্বাচনে বড় ফ্যাক্টর হয়ে উঠেছে। বিএনপির দুই বিদ্রোহী প্রার্থী—দক্ষিণ জেলা বিএনপির সাবেক যুগ্ম আহ্বায়ক মিজানুল হক চৌধুরী ও স্বেচ্ছাসেবক দলের সাবেক সভাপতি শফিকুল ইসলাম রাহী—স্বতন্ত্র প্রার্থী হিসেবে মাঠে আছেন।

মিজানুল হক চৌধুরীর বাড়ি সাতকানিয়ার বাজালিয়া ইউনিয়নে। তিনি ২০০৮ সালে বিএনপির প্রার্থীও ছিলেন। অন্যদিকে শফিকুল ইসলাম রাহীর বাড়ি খাগড়িয়া ইউনিয়নে। মনোনয়ন না পেয়ে তারা দল থেকে বহিষ্কৃত হলেও নিজ নিজ এলাকায় ভালো ভোট টানবেন বলে ধারণা স্থানীয়দের। এতে বিএনপির মূল প্রার্থী জসিম উদ্দিনের ভোট কমার আশঙ্কা রয়েছে।

বিদ্রোহী প্রার্থী শফিকুল ইসলাম রাহী বলেন,

“ভোটাররা এখন অনেক সচেতন। শুধু মার্কা নয়, প্রার্থীকেও বিবেচনায় নেয়। এলাকার মানুষ আমাকে ভালোবাসে। বিজয়ী হলে দল আমাকে আবার কাছে টেনে নেবে—এই বিশ্বাস আমার আছে।”
ইসলামী ফ্রন্টের প্রার্থী: নিরব কিন্তু কার্যকর ভোটব্যাংক এ আসনে বৃহত্তর সুন্নি জোট সমর্থিত ইসলামী ফ্রন্টের প্রার্থী মাওলানা সোলাইমান ফারুকীও আলোচনায় রয়েছেন। তিনি চন্দনাইশ উপজেলা পরিষদের তিনবারের নির্বাচিত ভাইস চেয়ারম্যান এবং গাউসিয়া কমিটি বাংলাদেশ’র চন্দনাইশ কাফন-দাফন টিমের সমন্বয়ক। ধর্মীয় ও সামাজিক কর্মকাণ্ডের কারণে তার একটি নির্দিষ্ট ভোটব্যাংক রয়েছে বলে মনে করা হচ্ছে।

শেষ হাসি কার?

সব মিলিয়ে চট্টগ্রাম-১৪ আসনে নির্বাচন এবার বহুমাত্রিক সমীকরণে আবদ্ধ। কারও পক্ষে রয়েছে পারিবারিক ইমেজ, কারও পক্ষে দলীয় প্রতীক, আবার কারও পক্ষে আঞ্চলিক আবেগ ও বিদ্রোহী মনোভাব। এই জটিল হিসাবের শেষে কে হাসবেন শেষ হাসি—সেটাই এখন দেখার বিষয়।

নিউজটি পোস্ট করেছেন : ডেস্ক রিপোর্ট

কমেন্ট বক্স

এ জাতীয় আরো খবর

সর্বশেষ সংবাদ